সরে গেলেন ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর

উরজিৎ প্যাটেল। ছবি: রয়টার্সউরজিৎ প্যাটেল। ছবি: রয়টার্সশেষ পর্যন্ত ইস্তফা দিলেন ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর উরজিত প্যাটেল। কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বেশ কিছুদিন ধরেই তাঁর মতানৈক্য চলছিল। ইস্তফাপত্রে তিনি লিখেছেন, ব্যক্তিগত কারণে এই সিদ্ধান্ত। তবে বিভিন্ন মহলের অনুমান, রিজার্ভ ব্যাংকের কাজকর্মে কেন্দ্রীয় সরকার যেভাবে হস্তক্ষেপ করছিল, তা তিনি মেনে নিতে পারেননি। ব্যাংকের তহবিলের টাকার একটা অংশ কেন্দ্রীয় কোষাগারে স্থানান্তরের জন্যও তাঁর ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল।

প্যাটেল ইস্তফা দিলেন সংসদের শীতকালীন অধিবেশন শুরু হওয়ার ঠিক আগের দিন। মঙ্গলবার এই অধিবেশন বসার দিনই প্রকাশিত হবে পাঁচ রাজ্য বিধানসভার ফল। বিরোধীরা এই সম্ভাব্য ফল নিয়ে প্রবল আশাবাদী। সংসদের ভেতর ও বাইরে বিজেপিবিরোধী আন্দোলন তীব্রতর করে তুলতে বিরোধী নেতারা সোমবার বিকেলে যখন সংসদ ভবনে মিলিত হন, তখনই উরজিত প্যাটেলের পতদ্যাগের খবর আসে। বৈঠক শেষ হওয়ার বেশ কিছুক্ষণ আগে বৈঠক থেকে বেরিয়ে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের বলেন, দেশে অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা জারি করেছে বিজেপি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশের অর্থনীতিকে উচ্ছন্নে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন। যাঁদের তিনি নিয়োগ করেছিলেন, তাঁরাই থাকতে না পেরে পদত্যাগ করছেন।
উরজিত প্যাটেল রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর হন ২০১৬ সালে রঘুরাম রাজনের মেয়াদ শেষ হলে। রাজনের আমলে তিনি ছিলেন ডেপুটি গভর্নর। এই পদে তাঁর মেয়াদ ছিল ২০১৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত। তার আগেই তিনি সরে গেলেন।
রিজার্ভ ব্যাংকের সঙ্গে সরকারের সংঘাতের শুরু রঘুরাম রাজনের সময় থেকে। ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের সিদ্ধান্তে তাঁর অনুমোদন ছিল না। যেভাবে এই নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং তার এক বছরের মধ্যে সারা দেশে পণ্য ও পরিষেবায় সমহারে কর ব্যবস্থা চালু করা হয়, রাজন তা মেনে নিতে পারেননি। প্রকাশ্যে কিছু না বললেও বিভিন্ন সূত্রে তাঁর অসন্তোষের খবর প্রকাশ হচ্ছিল। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর লোভনীয় প্রস্তাব ছেড়ে দেশের জন্য কাজ করার ইচ্ছাও তিনি প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময় সরকারের ‘খামখেয়ালিপনায়’ বিরক্ত হয়ে তিনি মেয়াদ শেষ হওয়ামাত্রই চলে যান। উরজিতের নিয়োগ তার পরেই। কিন্তু তাঁর কাজেও হস্তক্ষেপ করার খবর প্রকাশ পেতে থাকে। অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করার জন্য তাঁকে ক্রমাগত চাপ দেওয়া হতে থাকে। এই কাজে বাধা দেন প্যাটেল। রিজার্ভ ব্যাংকের ওপর কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের খবরদারিও তিনি মেনে নিতে পারেননি। সম্প্রতি তাঁর সঙ্গে অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলির বিবাদ বাধে জমা তহবিলের একটা অংশ কেন্দ্রীয় কোষাগারে দেওয়ার চাপ নিয়ে। কোষাগার ঘাটতি মেটাতেই এই কাজে গভর্নরকে রাজি হতে চাপ দেওয়া হচ্ছিল।
গভর্নরের পদত্যাগে সরকারের বিড়ম্বনা বাড়লেও প্রধানমন্ত্রী মোদি ও অর্থমন্ত্রী জেটলি তাঁর প্রশংসা করেছেন। মোদি টুইট করে বলেছেন, ‘একজন ভালো অর্থনীতিবিদের অভাব আমরা অনুভব করব।’ জেটলি লিখেছেন, গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর হিসেবে প্যাটেলের ভূমিকা প্রশংসনীয়। রঘুরাম রাজন বলেছেন, এই পদত্যাগে সব ভারতীয়র উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ আছে।
বিরোধী নেতারা অবশ্য এই পদত্যাগে রাজনৈতিকভাবে ‘উৎফুল্ল’। কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, সিপিআই, সিপিএম, এনসিপি, আরজেডি, ডিএমকে, তেলুগু দেশমসহ ২১ বিরোধী দলের নেতারা সোমবার বিজেপি–বিরোধী আন্দোলন তীব্রতর করে তুলতে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বলেন, রিজার্ভ ব্যাংক, সিবিআই, সুপ্রিম কোর্টসহ দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করার উদ্যোগ নিয়েছে এই সরকার। এই সুচিন্তিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে সবাই একজোট। এর প্রতিবাদে রাষ্ট্রপতির কাছে যাওয়ার বিষয় নিয়েও বিরোধী নেতারা আলোচনা করেন। ঠিক হয়, প্রয়োজনে সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। রাহুল জানান, রাফাল কেলেংকারি, কৃষক অসন্তোষ, হিন্দুত্ববাদ নিয়ে সবাই সংসদের ভেতর ও বাইরে আন্দোলন তীব্রতর করে তুলবে। সোমবারের বৈঠকে উত্তর প্রদেশের দুই গুরুত্বপূর্ণ দল সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজ পার্টির নেতারা উপস্থিত ছিলেন না। রাহুল বলেন, বিরোধী ঐক্য জোরদার করার প্রচেষ্টা চলছে। এ জন্য সময় প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.